Description
বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য একটি উল্লেখযোগ্য নাম। ছোটোদের জন্য গোয়েন্দা গল্প রচনায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর সৃষ্ট জাপানি গোয়েন্দা হুকা-কাশি ছোটোদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় একটি চরিত্র হয়ে উঠেছিল। হুকা-কাশিকে কখনও রিভলবার বা ছুরি হাতে শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়নি। মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের গোয়েন্দা গল্পের প্রধান আকর্ষণ হল, অতি তুচ্ছ কতকগুলি ‘ক্লু’ পরপর সাজিয়ে গ্রথিত সূত্র থেকে সমস্ত রহস্যটি ছবির মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কাহিনির একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে তার সমাধান ঘটানো হয়। তাই গল্পে শেষপর্যন্ত একটা আকর্ষণ বজায় থাকে।
তাঁর হাসির গল্পগুলিও বাংলা শিশুসাহিত্যের একটা বড়ো প্রাপ্তি। নির্মল অথচ বুদ্ধিদীপ্ত সেই হাসি। কোথাও অনর্থক স্থূলতা নেই, ভাঁড়ামো নেই। তারা সবাই নিছক মজার দেশের লোক। মহাভারত বা রামায়ণের যুগ থেকে নেমে এসে এ যুগের কামনা-বাসনার জালে জড়িয়ে পড়া সেই মহাকাব্যের মানুষগুলি কখনও গয়নার জন্য বায়না ধরে, কখনও বা নিজে ভয়ংকর রাক্ষস হয়েও আয়নায় নিজের বিকট চেহারা দেখে ভয় পেয়ে যায়। এমনই নানা মজার ঘটনায় ভরা তাঁর হাসির গল্পগুলি। সরলতাই তার প্রধান সম্পদ। তা শিশুদের সবুজ মনকে কোথাও আঘাত দেয় না। অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে দেয় শুধু। এককথায় মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য শিশুসাহিত্যের যে দুটি ধারায় সবচেয়ে সফল—তাঁর গোয়েন্দা গল্প আর হাসির গল্প—সেই দুটি ক্ষেত্রেই তিনি একেবারে স্বতন্ত্র। কোথাও কোনো অনুকরণ নেই, নেই সহজে প্রশংসা পাবার সুলভ ইচ্ছা।
ছোটোদের জন্যে লেখা তাঁর ‘দমাদম দামোদর’ নাটকটি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের এক আশ্চর্য সৃষ্টি। অলস, অকর্মণ্য দামোদর তার শ্যালকের কৌশলী চালের ফাঁদে পড়ে কেমন করে দমাদম মার খেয়ে বাধ্য হয়ে কবিরাজ বনে যায় আর কেমন করে এক আশ্চর্য উপায়ে অনেক টাকা রোজগার করে ফেলে তার মজার বৃত্তান্তে ভরা এই নাটকটি। নাটকটি শুধুমাত্র ছোটোদের কাছে পাঠোপযোগীই নয়, অভিনয়োপযোগীও বটে।
মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য ছোটোদের জন্যে ‘রামধনু’-র পাতায় অনেক প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তাঁর জীবনী বিষয়ক প্রবন্ধগুলিতে মনীষীদের জীবনের কয়েকটি বিশেষ দিকের ছবি তুলে ধরা হত যা ছোটোদের এক মহৎ জীবনের সন্ধান দিত। এ ছাড়াও ছিল বিভিন্ন স্থানের বর্ণনা নিয়ে কিংবা বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে লেখা প্রবন্ধ। এইসব প্রবন্ধের সাবলীল, আন্তরিক ভাষা ছোটোদের সহজেই বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলত।
‘শ্রীমাঠব্য’ বা ‘শ্রীমাধব্য’ ছদ্মনামে কখনও বা স্বনামে তিনি অনেকগুলি কবিতা লিখেছিলেন। কবিতার মধ্যে দিয়ে হাসির উপাদান তিনি ছড়িয়ে রাখতেন। মজার মজার কবিতাগুলি আরও জীবন্ত হয়ে উঠত ছবির সহযোগিতায়। অনেকটা যেন ‘আবোল তাবোল’-এর মতো হয়েও স্বকীয়তায় ভরপুর। তবে তাঁর লেখা মাত্র এগারোটি কবিতার সন্ধান পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের জীবিতকালের শেষ জন্মদিনে ‘রামধনু’ প্রকাশ করেছিল মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের লেখা ‘রবীন্দ্রনাথ’ নামক কবিতাটি যা প্রকাশের আগেই মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের অকালমৃত্যু তাঁর লেখনীকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
লেখক মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের অনেকগুলি পরিচয়, তিনি ছিলেন বহুবিধ প্রতিভার অধিকারী। কিন্তু সমস্ত পরিচয়কে ছাপিয়ে ওঠে তাঁর একটি পরিচয়। তা হল, তিনি ছোটোদের বন্ধু। ছোটোদের জন্যে নিবেদিতপ্রাণ এই মানুষটি কিন্তু মূলত ছোটোদেরই জন্যে কলম ধরেছিলেন। অন্যভাবে বলা যায়, তাঁর আর-সমস্ত পরিচয়গুলি তাঁর এই ছোটোদের বন্ধুর পরিচয়টিকেই গড়ে তোলে। তাঁর যাবতীয় সৃষ্টি, যাবতীয় কর্মপ্রচেষ্টা সেই বন্ধুত্বের প্রেরণা থেকেই উৎসারিত।
মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের যাবতীয় কিশোর রচনা এই প্রথম একটিমাত্র খণ্ডে দু-মলাটের মধ্যে এনে প্রকাশ করা হল ‘সমগ্র কিশোর সাহিত্য’। আশা কারা যায়, কালজয়ী এই লেখাগুলি বিস্মৃতির অতল থেকে উঠে এসে নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদেরও চিত্ত জয় করবে।







Reviews
There are no reviews yet.